তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে উন্নতি করতে হলে তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অপরিহার্য। তাল মিলিয়ে চলা বলতে সব ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া বা এটাকে অবলম্বন করে চলা। সকল ক্ষেত্র একসাথে বলায় এর ভেতর যোগাযোগও পড়ে। বর্তমান সময়ে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এজন্য দিন যত পার হচ্ছে আমরা সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উপর তত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতি। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ফেসবুক। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বিবিসির এক জরিপে জানা গেছে বর্তমানে শুধুমাত্র ঢাকায় সক্রিয় ফেসবুক একাউন্টের সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা দুই কোটি ২০ লাখ। এই বিশাল সংখ্যার ফেসবুক ব্যবহারকারীর অধিকাংশই যে তরুণ সেক্ষেত্রে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
ফেসবুক ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও তা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে ২০০৭ সলের দিকে এসে। আর বাংলাদেশে তা আরও পরে। ২০১০ সাল থেকে ফেসবুক মোটামুটি বাংলাদেশে অনেকে ব্যবহার করলেও সক্রিয় ইউজার কমই ছিল। মূলত ২০১৩ সালের পর থেকে ফেসবুক বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এবং বর্তমানে তরুণ বয়সী একজনের ফেসবুকে একটি সক্রিয় একাউন্ট নেই এ কথা চিন্তাই করা যায়না। পরিসংখ্যানিক হিসেবে যদি যাই তবে দেখতে পাবো
বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিলো প্রায় চার কোটি আট লাখ। এর ভেতর শুধুমাত্র ফেসবুক ব্যবহার করেন প্রায় তিন কোটি মানুষ, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ! অর্থাৎ বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ফেসবুকের সাথে সম্পৃক্ত। বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত একটি মজার তথ্য হচ্ছে বাংলাদেশে প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি ফেসবুক একাউন্ট খোলা হচ্ছে যা বর্তমান সময়ে দেশে শিশু জন্মহারের চেয়েও বেশি! অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশে ফেসবুকের প্রভাবটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিটিআরসির হিসাব মতে তিন কোটি মানুষ ফেসবুক চালায় তাদের শতকরা ৮০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই বিশাল তরুণ সমাজ কেনো ফেসবুকের প্রতি এত আকৃষ্ট এবং তাদের উপর ফেসবুক কি প্রভাব ফেলছে? এবং যে প্রভাব ফেলছে তা কি সবই ইতিবাচক নাকি কিছু নেতিবাচক প্রভাবও আছে?
সামগ্রিক অর্থে এটা বলা যায় সব উদ্ভাবনেরই ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক থাকে। ফেসবুকও এর ব্যতিক্রম নয়। কে কিভাবে তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করছে তাই হচ্ছে দেখার বিষয়। যেহেতু তরুণ সমাজই এই যোগাযোগ মাধ্যমটির সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত তাই তাদের উপরই প্রভাবটা বেশি পড়ে।
অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম হওয়ায় এর দারুন কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। তথ্য-আদান প্রদানের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। সময়ের স্বল্পতার এই যুগে খুব দ্রুত যোগাযোগ করতে পারাটা অতীব জরুরী। ফেসবুক আমাদেকে দিয়েছে সেই সুবিধাটা। তরুণরা এখন পড়াশোনা, সমাজ সেবা, রক্তদান, সামাজিক ক্যাম্পেইন, সৃজনশীল কাজ এবং ব্যবসার জন্যও ফেসবুক ব্যবহার করছে। ফেসবুকে এই তরুণদের দ্বারাই পরিচালিত অনেক গ্রুপ বা পেজ আছে যেখানে তারা সবাইকে যেকোন ধরনের সমস্যার সঠিক সমাধান দিচ্ছে। যেমন- শিক্ষার্থীদের জন্য আছে বিসিএস সহ যেকোন চাকরির জন্য পরামর্শ ভিত্তিক গ্রুপ, নারীদের জন্য আছে ‘জাস্টিস ফর উইমেন (বিডি)’ নামে একটি গ্রুপ যেখানে নারীরা তাদের যেকোন সমস্যার কথা জানাতে পারে এবং পরামর্শ পেতে পারে। স্বাস্থ্য নিয়ে আছে ‘দেহ’ নামে একটি পেজ। যেখানে শরীর সুরক্ষিত রাখার জন্য নানা পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়াও তরুনদের দ্বারা পরিচালিত নানান গ্রুপ বা পেজ ফেসবুকে আছে যা দিয়ে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
বর্তমানে সিটিজেন জার্নালিজমের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে। মেইন-স্ট্রিম মিডিয়াতে কোন কিছু প্রচার করতে গেলে শত চেষ্টা করেও অনেকে সময় প্রচার করা সম্ভব হয়না। কিন্তু ফেসবুক সেটা খুব সহজ করে দিয়েছে। কেউ চাইলেই যেকোন বক্তব্য, ভিডিওচিত্র, স্থিরচিত্র সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারে। খুব সহজেই। কোথাও কোন অন্যায় হচ্ছে, কোথাও ব্রিজ ঝুলে পড়েছে ছবি তুলে খুব সহজেই ভাইরাল করে দিকে পারে যেকেউ। সত্যি বলতে ফেসবুক তরুণ সমাজসহ সবাইকে গিয়েছে দিয়েছে স্থান, কাল ও পাত্রের স্বাধীনতা।
ফেসবুক তরুণদের চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত সহজ একটি প্লাটফর্ম। প্রতিদিন তারা কোন ইস্যুকে প্রাধান্য করে দিচ্ছে তাও বোঝা যায় এই মাধ্যম থেকে। এর মধ্য থেকেই দেখা যায় তাদের কোন মন্তব্য বা প্রচারণা ভাইরাল হয়, কোন ভিডিও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
এ প্রসঙ্গে একাটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পরে। সিলেটে শিশু রাজন হত্যার ঘটনা ভাইরাল হয়েছিলো এই ফেসবুকের মাধ্যমে। এবং পরবর্তীতে দোষীদের বিচারও হয় তরুণ কিছু ফেসবুক এক্টিভিস্টের তৎপরতার মুখে।
এরপর নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তি দাসের লাঞ্ছনার ঘটনাও আমরা প্রথম জানতে পারি ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিওর মাধ্যমে। এবং এটা ভাইরাল হওয়ার পর তরুণদের প্রতিবাদ এবং তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখেই সক্রিয় হয় মেইন-স্ট্রিম মিডিয়া এবং শেষমেষ দোষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাষ্ট্র।
ফেসবুকের মাধ্যমে গড়ে ওঠা তরুণ সমাজের আন্দোলন কতটা সুদুরপ্রসারী হতে পারে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১৩ সালে সংগঠিত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। সুতরাং ফেসবুকের সঠিক ব্যবহার করলে এটি ইতিবাচক বৈ অন্য কোন ফল বয়ে আনবেনা।
আগেই বলা হয়েছে প্রতিটি উদ্ভাবনেরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই থাকে। ফেসবুকও তার বাইরে নয়। সদ্ব্যব্যবহার করে যেমন ভালো উদ্দেশ্য হাসিল করা যায অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তেমনি খারাপ কাজও করা যায়।
ফেসবুকের অন্যতম নেতিবাচক দিক হচ্ছে এটি তরুণদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। অনেকে দেখা যায় ফেসবুক ব্যবহার করছে শুধু মজা করার উদ্দেশ্যে। একেক জনের দেখা যাচ্ছে একাধিক ফেক একাউন্ট রয়েছে। এবং সেগুলো ব্যবহার করে তারা নানান কুকর্ম সাধন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেক ছবি ব্যবহার করে আসল ব্যক্তিটিকে হেনস্থা করা, মেয়েদের ছবি নিয়ে অশালীন পোস্ট দেওয়া ইত্যাদি। এগুলো তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস। বলাই বাহুল্য এই প্রশ্ন ফাসের প্রধান মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে ফেসবুককে। এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের সম্ভাবনায় তরুণ সমাজও। এটি আমাদের জন্য মারাত্মক রকমের আশঙ্কার।
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক তরুণদের মধ্যে কিরকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তার একটি উদাহরণ দেওয়া পারে দৈনিক যুগান্তরের একটি রিপোর্টের সূত্র ধরে। সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায় ফেসবুকের মাধ্যমে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে এক তরুণ ও তরুণী মধ্যে প্রেম হয়। এবং পরবর্তীতে তারা পারিবারিক অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করে। বিয়ের পর তাদের মধ্যে পারিবারিক অশান্তিার জের ধরে কথাকাটাকাটি হয় এবং একময় তরুণটি তার স্ত্রীকে খুন করে। সমাজে ফেসবুকের নেতিবাচক ব্যবহার যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার একটি নমুনামাত্র ঘটনাটি। বন্ধুত্ব, ভালবাসা কিংবা প্রেম সেই আদিকাল থেকেই মানবিক জীবনে চিরন্তন বাস্তবতা। বিভিন্ন সময়ে এর বিকাশ বিভিন্নভাবে হয়েছে। কখনো বা হয়েছে চিঠি-পত্রের মাধ্যমে কখনো বা সাক্ষাতে। এই সময় গুলোতে সম্পর্কের বোঝাপড়া ছিলো দারুণ। তাদের মধ্যে ছিলো দারুণ পারস্পারিক ও আস্থা এবং বিশ্বাস। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে ফেসবুকের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সম্পর্কে থাকছেনা কোন বিশ্বাস বা পারস্পারিক আস্থা। থাকছে শুধু মুখের বুলি ও সস্তা আবেগ। আর এই সস্তা আবেগ নির্ভর সম্পর্কের পরিণতি হচ্ছে ভয়াবহ। কারও পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে, কেউ বা বাবা-মাকে ছেড়ে দিচ্ছে কেউ বা হয়ে যাচ্ছে মাদকাসক্ত। সর্বোপরি ফেসবুক নির্ভর এই সম্পর্কগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
একটা সময় দেখা যেতো তরুণরা খেলাধূলা করে সময় কাটাতো। আর এখন তারা সেই সময়টাতে ফেসবুকে চ্যাটিং করে সময় কাটাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে নিজের জীবনে যা ঘটছে সবই সে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানাচ্ছে। এক্ষেত্রে তার যে ব্যক্তিত্ব দিন দিন হৃাস পাচ্ছে সে তা বুঝতেও পারছেনা। মোটাদাগে ফেসবুক তরুনদের অনেকের(সবার নয়) উৎপাদনশীলতা, কর্মক্ষমতা, সৃজনশীলতা কেড়ে নিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে যা আমাদের সামাজিক অগ্রগতিকেই বাঁধাগ্রস্থ করছে।
ফেসবুকের আরেকটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে এর মাধ্যমে ভূয়া ,উদ্দেশ্যমূলক তথ্য বা ছবি ছড়ানো হচ্ছে। ধর্মীয় বক্তব্য দিয়ে নানা ধরণের উস্কানি ছড়ানো হচ্ছে। যার ফলে আমাদের সবার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এমনকি অনেক সময় খুন খারাবি পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি অনেকটা ঔষধের মতো। যার সুফল যেমন আছে পার্শ্বপতিক্রিয়াও আছে। এজন্য সেটিকে ঠিকমত ব্যবহার করতে জানতে হয় নাহলে তা রোগ সারানোর বদলে উল্টো রোগ বাড়িয়ে দিতে পারে।
একটি কাচের গ্লাসে পানি রাখা যায়, আবার মদও রাখা যায়। এতে গ্লাসের কোন দোষ নেই। ফেসবুকও ঠিক সেরকম। তরুণ সমাজ ফেসবুকের নেতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে নেতিবাচক দিকে ধাবিত হতে পারে আবার কোন উন্নয়নমূলক গ্রুপ, পেজ বা ইভেন্ট খুলে হাজার হাজার মানুষের উপকারও করতে পারে। তাই তরুণ সমাজকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে ফেসবুককে প্রযুক্তির আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য। যাতে তারা দেশ ও জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।