বৃহস্পতিবার, ৪ মে, ২০১৭

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: আমার ক্যাম্পাস..আমার আবেগের অন্য নাম

১২ অক্টোবর, ২০১২। পরদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে। দুদিন পর আমার সেখানে ভর্তি পরীক্ষা। সবকিছুই মোটামুটি গোছোনো শেষ। সোফার উপর বসে বসে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটে সার্চ দিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় লিখে। প্রথমেই যে লেখাটি আসলো তা হল “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগ ও কিছু কথা”। বুঝলাম না ঠিক এই র‌্যাগ জিনিসটা কি! লিংকে ঢুকে যা দেখলাম তা পড়ে আমরা চক্ষু চড়কগাছ। নতুন শিক্ষার্থীদের উপর আদিম উপায়ে  নির্যাতনের নানা কাহিনী লেখা ছিলো সেখানে। আমি আব্বু-আম্মুকে সঙ্গে সঙ্গে জানালাম ঘটনাটা। এবং একপ্রকার সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেললাম আমি জাবিতে পরীক্ষা দিচ্ছিনা। কিছুক্ষণ পর আব্বুর কাছে একটি ফোন আসে আমার এক পরিচিত আপু থেকে। সে ঘটনাটি জানতে পেরে আমাকে আশ্বস্ত করে যে এরকম কিছুই ঘটবেনা। আমি বলছি, তুমি পরীক্ষাটা দাও। শেষ পর্যন্ত এক প্রকার বাধ্য হয়েই আমি রাজি হলাম।

পরদিন ১৩ অক্টোবর, ২০১২। ডেইরি গেটে এসে বাস থেকে আব্বুর সঙ্গে নামলাম। ক্যাস্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম লোকে লোকারণ্য! (ভর্তি পরীক্ষার কারণে প্রচুর মানুষ ছিলো আসলে) আমার একদমই ভাল লাগলোনা পরিবেশটা । উঠলাম বঙ্গবন্ধু হলে এক পরিচিত ভাইয়ের কাছে। আব্বু আমাকে রেখে চলে গেলো। ভয়ে ভয়ে ঐ রাতটা কাটালাম। পরবর্তী কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি ইউনিটে পরীক্ষা দিলাম। চান্সও পেলাম কয়েকটিতে। আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরও আপেক্ষাকৃত পছন্দের সাবজেক্ট পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভতি হলাম সেই জাবিতেই। কি অদ্ভুত না? যেখানে পরীক্ষাই দিতে চাচ্ছিলাম না সেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার পরও ভর্তি হলাম এখানেই। অখুশি হয়তো হইনি কিন্তু অবাক হয়েছিলাম যথেষ্টই। কেননা এখানে তো আমার পরীক্ষাই দেওয়ার কথা ছিলোনা! যাই হোক র‌্যাগের ভয় যেহেতু ভেতরে ছিলো তাই হলে ওঠার সাহস পেলাম না। উঠলাম সাভারের ছায়াবিথীতে।

২৬ জানুয়ারী, ২০১৩। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাস ছিলো সেদিন। ভয়ে ভয়ে নতুন কলার নিচ তলায় একটি ক্লাসে গিয়ে বসলাম। কাউকে চিনিনা। পরে জানলাম আমদের ক্লাস হবেনা সেদিন। শুধু নতুন ব্যাচ হিসেবে বরণ করে নেওয়া হবে। 

অনুষ্ঠানটির দুটো পর্ব ছিলো। একটি হচ্ছে শিক্ষকরা কথা বলবেন এবং পরে গিয়ে ইমিডিয়েট সিনিয়ররা কথা বলবেন। শিক্ষকরা যত সময় ছিলো বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। এরপর শিক্ষকরা চলে যাওয়ার পর সিনিয়ররা কথা বলতে আসলেন। সত্যি বলতে তাদের কড়া কথা শুনে খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু পরবর্তীতে বুঝতে পারি আসলে সেদিন তারা আমাদের কড়া ভাবে কথা বললেও তা ছিলো শুধুই আমাদেরকে শেখানোর উদ্দেশ্যেই। ক্যাম্পাসে যাতে আমরা ভালোভাবে চলতে পারি সেজন্যই তারা আমাদের কিছু সাধারণ জিনিস শিখিয়ে দিয়েছিলেন। 

সত্যি বলতে প্রথম দিকে ক্যাম্পাস টাকে খুব বেশি ভালো লাগতো না। নিজেকে মনে হতো পরাধীন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতাম তা কেনো যেন মেলাতে পারতাম না।  কিন্তু কিছুদিন যাবার পরই আমার সকল সংশয় কেটে গেলো। ক্যাম্পাসের কালচারটা বুঝতে শুরু করলাম। বুঝতে পারলাম আমি আসলে এতদিন ভুলই বুঝেছি।

প্রথম দিকে হলে না উঠলেও প্রথম বর্ষের মাঝামাঝিতে হলে উঠি আমি। বেশ কিছুদিন গণরুমেও থেকেছি আমি। কষ্ট করেই থাকতে হয়েছে বটে সেখানে। কিন্তু এই একসাথে থাকার ফলে সবার সাথে যে হৃদ্যতা তৈরি হয়েছিলো তা আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে  আমার হতো বলে মনে হয়না।
  
আস্তে আস্তে ক্যাম্পাসের প্রেমে পড়ে যেতে শুরু করি আমি। খারাপ লাগা গুলোও একসময় ভালো লাগায় পরিণত হয়। ঐ একসাথে গণরুমে থাকার কষ্টটাও পরে আনন্দে পরিণত হয়। যে সিনিয়র গুলো সবচেয়ে রাফ ব্যবহার করতো, যাদেরকে দেখে ভয়ে জুবুথুবু হয়ে থাকতাম একসময় দেখা গেছে তারাই সবচেয়ে বেশি কাছের হয়ে গেছে। হলের খাবার খেতেও একসময় খুব কষ্ট হতো। এখন যে হয়না তা নয়। তবে কেনো যেনো ঐ খাবারগুলোর প্রতিও এখন ভালবাসা তৈরি হয়ে গেছে। 

আমার ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত। প্রতিটি ঋতুতে এটি রুপ বদলায়। আর এখানে প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে আলাদা আলাদা সৌন্দর্য্য।




গ্রীষ্মকাল আসলে একসাথে কাাঁচা আম পেড়ে ভর্তা মাখানো কিংবা টারজান পয়েন্টে বিভিন্ন ফলের জুস খাওয়া ছিলো আমাদের রুটিন মাফিক। নিয়ম করে এটা করতাম আমরা।  কিংবা প্রচন্ড গরমের সন্ধ্যায় সারা দেশের সব জায়গার মানুষের প্রাণ যেখানে অতিষ্ট সেখানে ব্যাতিক্রম ছিলো আমার ক্যাম্পাস। প্রচন্ড রৌদ্রতাপের দিনেও জাবিতে সুশীতল বাতাস বইতো।  গরমের সন্ধ্যায় জাবির সেন্ট্রাল ফিল্ড ছিলো যেনো এক টুকরো স্বর্গ। সবাই মিলে ঝিরিঝিরি বাতাসে ডেয়ার-ট্রুথ গেম খেলার আনন্দের কথাও ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা বন্ধুরা সন্ধ্যায় যারা এটা খেলতাম তারাই শুধু জানি এর মজাটা কি।

জাবিতে বর্ষা কতটা মাদকতা ছড়াতে পারে তা শুধু যারা বৃষ্টিতে ভিজেছে তারাই বলতে পারে।  বৃষ্টি হওয়ার পর পিচ ঢালা রাস্তায় দলবেধে হাাঁটাও জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহুর্তগুলোর ভেতর একটা। লেকগুলো এসময় পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। লেকগুলোতে মাছ ধরতে গেলে অনেক মাছও পাওয়া যায় এসময়। 

তবে জাবি তার শ্রেষ্ঠ রুপ প্রকাশ করে সম্ভবত শীতকালে। শীতকালের সকালে ছবি তোলা বা একসাথে কুয়াশার চাদর মোড়ানো সকালে ঘুরে বেড়ানোর মত আনন্দদায়ক অনুভুতি বোধহয় আর নেই। শীতের সকালে ডেইরি গেটে এসে গরুর দুধের চা খেয়ে নাস্তা করে পুরো ক্যাম্পাস চক্কর  দেওয়ার আনন্দ টাও সীমাহীন। শীতকালে জাবির অতিথি পাখি সম্ভবত পুরো বাংলাদেশের ভেতরেই আলাদা কিছু। প্রতি শীতেই দেখা যায় সূদুর সাইবেরিয়া থেকে এখানকার লেকগুলোতে শতশত প্রজাতির পাখি আসে।






আর সেগুলো অবলোকন করতে ছুটির দিনগুলোতে বহু দূর থেকেও পর্যটকরা আসে। হয়তো অনেক সময় আমরা নিজেরাও এত এত মানুষ দেখে বিরক্ত হই। কিন্তু পরক্ষণেই গর্বে বুকটা ভরে যায় নিজের ক্যাস্পাসের এরকম গ্রহণযোগ্যতা দেখে।শীতের সময়ে জাবির পিঠা চত্ত্বরের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার ভেতর জাবিতে নানা ধরনের পিঠার পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। এগুলো খেতে যেমন সুস্বাদু দেখতেও তেমনি চমৎকার। আর এজন্য জাবির শীতকাল বিশেষ কিছুই আমাদের জন্য।

সারাদেশের ভেতর একমাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রজাপতি মেলা বসে। এটি নি:সন্দেহে স্বতন্ত্র একটি মেলা। বহু দুর-দুরান্ত থেকে এই প্রজাপতি মেলা দেখার জন্য মানুষ আসে এই ক্যাম্পাসে। গত চার বছরে আমার নিজেরও অনেক বন্ধু ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসেছিলো শুধুমাত্র প্রজাপতি মেলা দেখার উদ্দেশ্যে। এখানে প্রায় ১০০ প্রজাতির প্রজাপতি প্রদর্শিত হয় প্রতিবছর। 

জাবিকে বলা হয় সাংস্কৃতিক রাজধানী। শুধু শুধু যে এটা বলা হয়না তার প্রমাণ পাওয়া যায় সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে গেলেই। খুব কম দিনই আমি নিজে দেখেছি যে ওখানে কোন প্রোগ্রাম থাকেনা। সেটা হোক লোকাল কোন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রোগ্রাম কিংবা বাইরে থেকে আনা কারও পরিবেশিত প্রোগ্রাম। আমার জানা নেই আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এত প্রোগ্রাম হয় কিনা। 

আমি নিজে যদি মতামত দিই.. তবে বলবো জাবির দিন অপেক্ষা রাতের সৌন্দর্য্য বেশি। রাতের ক্যাম্পাসে ঘুরতে বের হলে দেখা যায় ট্রান্সপোর্টে ছেলে-মেয়েরা গান গাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। টারজান পয়েন্টে গেলে বন্ধুদের হাসি মাখা মুখগুলো চোখে পড়ে। ক্যাফেটেরিয়ার সামনে গেলেও দেখা যায় একই অবস্থা। বটতলা তো সবসময়ই মুখরিতই থাকে। রাত হলে তা যেনো আরও পূর্ণতা পায়। যেখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত আটটা বাজলেই সবাইকে হলে ফিরে যেতে হয় । সেখানে জাবিতে সন্ধ্যায় হয় আটটার সময়! আর এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা। রাত ১২ টা পর্যন্ত বাইরে থাকলেও এখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোন চিন্তা করতে হয়না। বিশেষ করে জাবির চেয়ে নিরাপদ জায়গা মেয়েদের জন্য আর কোথাও মনে হয়না আছে।

আমার ক্যাম্পাসের আরেকটি বড় ভালবাসা, আবেগের জায়গা হচ্ছে আমার বিভাগ। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ণ বিভাগ। অনেক অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বিভাগের সঙ্গে। স্মৃতি থাকার মতো যথেষ্ট কারণও আছে। বন্ধু-বান্ধব, বন্ধুর মতো কয়েকজন শিক্ষক সবার সাথেই এতদিনে গড়ে উঠেছে হৃদ্যতার সম্পর্ক । এজন্য এখন প্রতিদিন যখন ক্লাসে যাই তখন একটা দিক থেকে খুব খারাপ লাগে যে এক এক দিন করে কমে আসছে সময়। আর যে খুব বেশি দিন নেই আমরা! সত্যি বলতে যেদিন এই বিভাগ, এই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে হবে জানিনা কিভাবে নিজেকে সমাল দিবো।

আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি যেখানে আমি ভর্তি পরীক্ষা দিবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভাগ্য আমাকে এখনেই নিয়ে এসছিলো। আমার ভাগ্যের কাছে সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ। প্রথম দিকের সেই খারাপ লাগার কথা মনে হলে এখন আমার আফসোস হয় যে অযথাই এতগুলো সুন্দর সময় নষ্ট করেছি!  এটা আমার বলতে একদম দ্বিধা নেই যে এটিই আমার দ্বিতীয় জন্মের আঁতুড়ঘর। আমার পরিচয়। আমার ভালবাসা, আমার আবেগের জায়গা। ভালবাসি “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়”। ভালবাসি তোমার লাল ইটের ভবন গুলো, ভালবাসি তোমার মাটি, ফুল, পাখি সবকিছু।  

তরুণ সমাজের ইতিবাচক বনাম নেতিবাচক ভূমিকা: প্রেক্ষিত ফেসবুক


তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে উন্নতি করতে হলে তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অপরিহার্য। তাল মিলিয়ে চলা বলতে সব ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া বা এটাকে অবলম্বন করে চলা। সকল ক্ষেত্র একসাথে বলায় এর ভেতর যোগাযোগও পড়ে। বর্তমান সময়ে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এজন্য দিন যত পার হচ্ছে আমরা সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উপর তত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতি। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ফেসবুক। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বিবিসির এক জরিপে জানা গেছে বর্তমানে শুধুমাত্র ঢাকায় সক্রিয় ফেসবুক একাউন্টের সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা দুই কোটি ২০ লাখ। এই বিশাল সংখ্যার ফেসবুক ব্যবহারকারীর অধিকাংশই যে তরুণ সেক্ষেত্রে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

ফেসবুক ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও তা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে ২০০৭ সলের দিকে এসে। আর বাংলাদেশে তা  আরও পরে। ২০১০ সাল থেকে ফেসবুক মোটামুটি বাংলাদেশে অনেকে ব্যবহার করলেও সক্রিয় ইউজার কমই ছিল। মূলত ২০১৩ সালের পর থেকে ফেসবুক বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এবং বর্তমানে তরুণ বয়সী একজনের ফেসবুকে একটি সক্রিয় একাউন্ট নেই এ কথা চিন্তাই করা যায়না। পরিসংখ্যানিক হিসেবে যদি যাই তবে দেখতে পাবো বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালের আগস্টে  বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিলো প্রায় চার কোটি আট লাখ। এর ভেতর শুধুমাত্র ফেসবুক ব্যবহার করেন প্রায় তিন কোটি মানুষ, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ! অর্থাৎ বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ফেসবুকের সাথে সম্পৃক্ত। বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত একটি মজার তথ্য হচ্ছে বাংলাদেশে প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি ফেসবুক একাউন্ট খোলা হচ্ছে যা বর্তমান সময়ে দেশে  শিশু জন্মহারের চেয়েও বেশি! অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশে ফেসবুকের প্রভাবটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। 



বিটিআরসির হিসাব মতে  তিন কোটি মানুষ ফেসবুক চালায় তাদের শতকরা ৮০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই বিশাল তরুণ সমাজ কেনো ফেসবুকের প্রতি এত আকৃষ্ট এবং তাদের উপর ফেসবুক কি প্রভাব ফেলছে? এবং যে প্রভাব ফেলছে তা কি সবই ইতিবাচক নাকি কিছু নেতিবাচক প্রভাবও আছে?

সামগ্রিক অর্থে এটা বলা যায় সব উদ্ভাবনেরই  ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক থাকে। ফেসবুকও এর ব্যতিক্রম নয়। কে কিভাবে তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করছে তাই হচ্ছে দেখার বিষয়। যেহেতু তরুণ সমাজই এই যোগাযোগ মাধ্যমটির সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত তাই তাদের  উপরই প্রভাবটা বেশি পড়ে। 

অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম হওয়ায় এর দারুন কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। তথ্য-আদান প্রদানের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। সময়ের স্বল্পতার এই যুগে খুব দ্রুত যোগাযোগ করতে পারাটা অতীব জরুরী। ফেসবুক আমাদেকে দিয়েছে সেই সুবিধাটা। তরুণরা এখন পড়াশোনা, সমাজ সেবা, রক্তদান, সামাজিক ক্যাম্পেইন, সৃজনশীল কাজ এবং ব্যবসার জন্যও ফেসবুক ব্যবহার করছে। ফেসবুকে এই তরুণদের দ্বারাই পরিচালিত অনেক গ্রুপ বা পেজ আছে যেখানে তারা সবাইকে যেকোন ধরনের সমস্যার সঠিক সমাধান দিচ্ছে। যেমন- শিক্ষার্থীদের জন্য আছে বিসিএস সহ যেকোন চাকরির জন্য পরামর্শ ভিত্তিক গ্রুপ, নারীদের জন্য আছে ‘জাস্টিস ফর উইমেন (বিডি)’ নামে একটি গ্রুপ যেখানে নারীরা তাদের যেকোন সমস্যার কথা জানাতে পারে এবং পরামর্শ পেতে পারে। স্বাস্থ্য নিয়ে আছে ‘দেহ’ নামে একটি পেজ। যেখানে শরীর সুরক্ষিত রাখার জন্য নানা পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়াও তরুনদের দ্বারা পরিচালিত নানান গ্রুপ বা পেজ ফেসবুকে আছে যা দিয়ে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষ উপকৃত হচ্ছে।

বর্তমানে সিটিজেন জার্নালিজমের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে। মেইন-স্ট্রিম মিডিয়াতে কোন কিছু প্রচার করতে গেলে শত চেষ্টা করেও অনেকে সময় প্রচার করা সম্ভব হয়না। কিন্তু ফেসবুক  সেটা খুব সহজ করে দিয়েছে। কেউ চাইলেই যেকোন বক্তব্য, ভিডিওচিত্র, স্থিরচিত্র সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারে। খুব সহজেই। কোথাও কোন অন্যায় হচ্ছে, কোথাও ব্রিজ ঝুলে পড়েছে ছবি তুলে খুব সহজেই ভাইরাল করে দিকে পারে যেকেউ। সত্যি বলতে ফেসবুক তরুণ সমাজসহ সবাইকে গিয়েছে দিয়েছে স্থান, কাল ও পাত্রের স্বাধীনতা।

ফেসবুক তরুণদের চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত সহজ একটি প্লাটফর্ম। প্রতিদিন তারা কোন ইস্যুকে প্রাধান্য করে দিচ্ছে তাও বোঝা যায় এই মাধ্যম থেকে। এর মধ্য থেকেই দেখা যায় তাদের কোন মন্তব্য বা প্রচারণা ভাইরাল হয়, কোন ভিডিও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

এ প্রসঙ্গে একাটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পরে। সিলেটে শিশু রাজন হত্যার ঘটনা ভাইরাল হয়েছিলো এই ফেসবুকের মাধ্যমে। এবং পরবর্তীতে দোষীদের বিচারও হয় তরুণ কিছু ফেসবুক এক্টিভিস্টের তৎপরতার মুখে।

এরপর নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তি দাসের লাঞ্ছনার ঘটনাও আমরা প্রথম জানতে পারি ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিওর মাধ্যমে। এবং এটা ভাইরাল হওয়ার পর তরুণদের প্রতিবাদ এবং তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখেই সক্রিয় হয় মেইন-স্ট্রিম মিডিয়া এবং শেষমেষ দোষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাষ্ট্র। 

ফেসবুকের মাধ্যমে গড়ে ওঠা তরুণ সমাজের আন্দোলন কতটা সুদুরপ্রসারী হতে পারে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১৩ সালে সংগঠিত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। সুতরাং  ফেসবুকের সঠিক ব্যবহার করলে এটি ইতিবাচক বৈ অন্য কোন ফল বয়ে আনবেনা।

আগেই বলা হয়েছে প্রতিটি উদ্ভাবনেরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই থাকে। ফেসবুকও তার বাইরে নয়। সদ্ব্যব্যবহার করে যেমন ভালো উদ্দেশ্য হাসিল করা যায অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তেমনি খারাপ কাজও করা যায়। 

ফেসবুকের অন্যতম নেতিবাচক দিক হচ্ছে এটি তরুণদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। অনেকে দেখা যায় ফেসবুক ব্যবহার করছে শুধু মজা করার উদ্দেশ্যে। একেক জনের দেখা যাচ্ছে একাধিক ফেক একাউন্ট রয়েছে। এবং সেগুলো ব্যবহার করে তারা নানান কুকর্ম সাধন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেক ছবি ব্যবহার করে আসল ব্যক্তিটিকে হেনস্থা করা, মেয়েদের ছবি নিয়ে অশালীন পোস্ট দেওয়া ইত্যাদি। এগুলো তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। 

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস। বলাই বাহুল্য এই প্রশ্ন ফাসের প্রধান মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে ফেসবুককে। এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের সম্ভাবনায় তরুণ সমাজও। এটি আমাদের জন্য মারাত্মক রকমের আশঙ্কার। 

সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক তরুণদের মধ্যে কিরকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তার একটি উদাহরণ দেওয়া পারে দৈনিক যুগান্তরের একটি রিপোর্টের সূত্র ধরে। সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায় ফেসবুকের মাধ্যমে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে এক তরুণ ও তরুণী মধ্যে প্রেম হয়। এবং পরবর্তীতে তারা পারিবারিক অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করে। বিয়ের পর তাদের মধ্যে পারিবারিক অশান্তিার জের ধরে কথাকাটাকাটি হয় এবং একময় তরুণটি তার স্ত্রীকে খুন করে। সমাজে ফেসবুকের নেতিবাচক ব্যবহার যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার একটি নমুনামাত্র ঘটনাটি। বন্ধুত্ব, ভালবাসা কিংবা প্রেম সেই আদিকাল থেকেই মানবিক জীবনে চিরন্তন বাস্তবতা। বিভিন্ন সময়ে এর বিকাশ বিভিন্নভাবে হয়েছে। কখনো বা হয়েছে চিঠি-পত্রের মাধ্যমে কখনো বা সাক্ষাতে। এই সময় গুলোতে সম্পর্কের বোঝাপড়া ছিলো দারুণ। তাদের মধ্যে ছিলো দারুণ পারস্পারিক ও আস্থা এবং বিশ্বাস। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে ফেসবুকের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সম্পর্কে থাকছেনা কোন বিশ্বাস বা পারস্পারিক আস্থা। থাকছে শুধু মুখের বুলি ও সস্তা আবেগ। আর এই সস্তা আবেগ নির্ভর সম্পর্কের পরিণতি হচ্ছে ভয়াবহ। কারও পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে, কেউ বা বাবা-মাকে ছেড়ে দিচ্ছে কেউ বা হয়ে যাচ্ছে মাদকাসক্ত। সর্বোপরি  ফেসবুক নির্ভর এই সম্পর্কগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

একটা সময় দেখা যেতো তরুণরা খেলাধূলা করে সময় কাটাতো। আর এখন তারা সেই সময়টাতে ফেসবুকে চ্যাটিং করে সময় কাটাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে নিজের জীবনে যা ঘটছে সবই সে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানাচ্ছে। এক্ষেত্রে তার যে ব্যক্তিত্ব দিন দিন হৃাস পাচ্ছে সে তা বুঝতেও পারছেনা। মোটাদাগে ফেসবুক তরুনদের অনেকের(সবার নয়) উৎপাদনশীলতা, কর্মক্ষমতা,  সৃজনশীলতা কেড়ে নিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে যা আমাদের সামাজিক অগ্রগতিকেই বাঁধাগ্রস্থ করছে।

ফেসবুকের আরেকটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে এর মাধ্যমে ভূয়া ,উদ্দেশ্যমূলক তথ্য বা  ছবি ছড়ানো হচ্ছে। ধর্মীয় বক্তব্য দিয়ে নানা ধরণের উস্কানি ছড়ানো হচ্ছে। যার ফলে আমাদের সবার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এমনকি অনেক সময় খুন খারাবি পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি অনেকটা ঔষধের মতো।  যার সুফল যেমন আছে পার্শ্বপতিক্রিয়াও আছে। এজন্য সেটিকে ঠিকমত ব্যবহার করতে জানতে হয় নাহলে তা রোগ সারানোর বদলে উল্টো রোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। 

একটি কাচের গ্লাসে পানি রাখা যায়, আবার মদও রাখা যায়। এতে গ্লাসের কোন দোষ নেই। ফেসবুকও ঠিক সেরকম। তরুণ সমাজ ফেসবুকের নেতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে নেতিবাচক দিকে ধাবিত হতে পারে আবার কোন উন্নয়নমূলক গ্রুপ, পেজ বা ইভেন্ট খুলে হাজার হাজার মানুষের উপকারও করতে পারে। তাই তরুণ সমাজকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে ফেসবুককে প্রযুক্তির আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য। যাতে তারা দেশ ও জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।


সোমবার, ২৭ মার্চ, ২০১৭

বড় দল হয়ে ওঠার সূচনা হয়তো এটাই..

স্বপ্ন দেখতাম এই বাংলাদেশেরই হয়তো। যে বাংলাদেশ একটি জয় পেয়েই অতিউৎযাপন করবেনা বরং পেশাদার এবং প্রতিষ্ঠিত দলের মতো করমর্দন করেই মাঠ থেকে বেরিয়ে আসবে। এটাই তো বড় দলের প্রথম লক্ষন! একটা সাধারণ জয়েই অনেক বেশি মাতামাতি না করে সামনের ম্যাচের দিকে নজর দেওয়া।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ডাম্বুলাতে প্রথম ম্যাচ জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে দেখা গেছে সাধারণভাবে জয় উৎযাপন করে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসতে। এটি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে কয়েকবছর আগে যখন বাংলাদেশ সাধারণ একটি জয় পেলেও পুরো মাঠ জাতীয় পতাকা হাতে দৌড়ে বেড়াতো। আর প্রতিপক্ষ এটাকে বলতো “আপসেট”। বিদেশী সংবাদপত্র খবর গুলো প্রচার করতো অঘটন হিেেসবে । খুশি হতাম অবশ্যই বাংলাদশের জয়ে কিন্তু কেন যেন তৃপ্তি পেতাম না। এলাকায় সবাই মিলে মিছিল বের করতো কিন্তু আমি চুপ করে ঘরে বসে থাকতাম। আনেকে আমার এমন আচরণ দেখে এটাও ভাবতো যে আমি হয়তো বাংলাদেশের জয়ে খুশি নই! কষ্ট পেয়েছি। আসলে ব্যাপারটা মোটেও সেরকম ছিলো না। সত্যি বলতে আমি যেভাবে চাইতাম সেই প্রতিপত্তি নিয়ে বাংলাদেশ জিততো না কখোনোই। এখনও যে বাংলাদেশ পরাশক্তি হয়ে গেছে সেটা বলছিনা আমি। কিন্ত কেন যেন গত ম্যাচে ভিন্ন এক বাংলাদেশকে আবিস্কার করলাম। দেখলাম একদম বড় দল যেভাবে ডমিনেট করে জেতে সেভাবেই জিতলো টাইগাররা। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিন বিভাগেই তাদের পারফরমেন্স ছিলো দুর্দান্ত। সবার চোখে দেখতে পেলাম দারুণ আত্মবিশ্বাস, শারীরী ভাষাতে ছিলো কখোনেই না হারার প্রতিজ্ঞা।

আমার ভুলও হতে পারে। আনেকের চোখে এর আগেও বাংলাদেশ এমন খেলে থাকতে পারে। কিন্তু আমার চোখে এবারই প্রথম আমার “আকাঙ্ক্ষিত” বাংলাদেশ ধরা পড়েছে। এটাই হয়তো নতুন দিনের সূচনা। এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। মনে প্রাণে বিশ্বাস করি এই বাংলাদেশের পাওয়ার আছে আরও আনেক কিছু।

রবিবার, ২৬ মার্চ, ২০১৭

একটি অপেক্ষা ও কিছু মধুর স্মৃতি

২০০৪ কি ০৫ সালের কথা। ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে পড়ি। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি তুমুল আকর্ষণ থাকায় খেলা দেখতে এবং খেলার খোঁজ খবর রাখতে দারুণ পছন্দ করতাম। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বাসায় রাখা পত্রিকার খেলার পাতাটা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়তাম। একদিন পড়তে গিয়ে হঠাৎ একটা খবরে চোখ আটকালো। ঠিক মনে নেই যদিও তবে মনে হয় দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কোন একটি ম্যাচে তামিম নামে কেউ একজন “৫২” রান করেছে এরকম একটা কিছু দেখলাম। আমার চোখ উজ্জল হয়ে উঠলো। একে তো ক্রিকেট দারুন পছন্দ করি তারপর যদি আবার নিজের নামে কেউ খেলে তাহলে তো কথাই নেই। সত্যি বলতে সেদিন থেকে অপেক্ষা শুরু করি কবে জাতীয় দলে চান্স পাবে আমার “মিতা” এবং আমি তার খেলা দেখবো। এরপর আনেক দিন কেটে গেছে।  এসম্পর্কিত আর কোন কিছু চোখে পড়েনি। তবে আগ্রহ যে কমে গেছে তা একদম নয়। এতকিছু বুঝতাম না চান্স পাওয়ার হিসাব কিন্ত কেন যেন মনে হত আমার অপেক্ষা ফুরোবে।

২০০৬ সালের শেষের দিকে একদিন বিটিভির রাত ১০ টার ইংরেজি সংবাদ দেখছি। সম্ভবত প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগের সেদিনের খেলার ফলাফল দেখাচ্ছিলো। দেখালাম তামিম নামে একজন ১৮৮ করেছে। আমি বুঝতে পারলাম আমার আপেক্ষার দিন খুব সহসাই ফুরোবে।

১৭ মার্চ, ২০০৭। বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ। ভারত আগে ব্যাট করে বাংলাদেশকে ১৯২ রানের টার্গেট দিলো। হয়তো কম বোঝার কারণেই স্কোয়াডে কে আছে কে নেই সেটা খেয়াল করা হয়নি আমার। দেখলাম চিকনা গড়ন এবং পজিটিভ বডি ল্যাংগুজের একটা ছেলে শাহরিয়ার নাফীসের সঙ্গে ইনিংস ওপেন করতে নামলো। ছেলেটির নাম তামিম ইকবাল খান। প্রথম দিনই সে জহির খান, হরভজন সিংদের পিটিয়ে সারা বিশ্বের সঙ্গে আমারও মন জয় করে নিলো। আমার অপেক্ষা সার্থক হলো।

এরপর ২০১০ সালে মিরপুরে ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি, লডর্স, ওল্ড ট্রাফের্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি কিংবা ২০১২ সালের এশিয়া কাপে সমালোচনার জবাব দেওয়া টানা চার হাফ সেঞ্চুরি শুধু মুগ্ধতাই বাড়িয়েছে। গত দশ বছরে তিনি কখনো আমাকে আনন্দে ভাসিয়েছেন কখনো বা করেছেন হতাশ কিন্তু কখনোই তার প্রতি আমার আগ্রহ কমেনি এতটুকু। অনেকের কাছে তর্কসাপেক্ষে দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হলেও আমার কাছে তিনি কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সবসময়ের সেরা।

আজ যখন এই লেখাটা লিখছি তখন তিনি দেশের হয়ে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে সব ধরণের ক্রিকেট মিলিয়ে দশ হাজার রানের মলিক হয়েছেন। নিশ্চই বড় অর্জন। তবে আমি বিশ্বাস করি তিনি এর চেয়ে আনেক বড় কিছু করার সামর্থ্য রাখেন। আর তিনি তা পারবেন এই বিশ্বাসও আমি রাখি।

প্রিয় “মিতা” আপনি স্বপ্ন দেখেন “এক ইনিংসে একাই ৪০০-৫০০ রান করে ফেলার” আপনি স্বপ্ন দেখেন. “দলের প্রয়োজন দুই ওভারে ৬০ রান এবং সেই ম্যাচ আপনি জিতিয়ে দিয়েছেন” স্বপ্নগুলো অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হলেও আমার কেন যেন মনে হয় আপনি এগুলোও পারবেন।  আপনার স্বপ্নগুলো সত্যি হোক এই কামনা করি।

বুধবার, ২২ মার্চ, ২০১৭

শততম টেস্টে বাংলাদেশের জয় এবং শ্রীলঙ্কার শোকের মাতম


গত ১৯ মার্চ বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শততম টেস্টে জয়লাভ করেছে। স্বাভাবিক ভাবেই এটি বাংলাদেশের জন্য বড় আনন্দের উপলক্ষ্য। বিশেষ করে গল টেস্টে পরাজিত হবার পরের টেস্টেই শ্রীলঙ্কার মত দলকে টেস্টে পরাজিত করা বিশেষ কিছুই। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা প্রথম বারের মত বাংলাদেশের কাছে নিজেদের মাটিতে টেস্টে পরাজিত হয়েছে। এটা তাদের জন্য কষ্টের অবশ্যই। কিন্তু তারা যেভাবে শোক পালন করছে তা রীতিমত দৃষ্টিকটু।

কলোম্বো টেস্ট চলাকালীন সময়ই শ্রীলঙ্কান ব্যাটসমান করুনারত্নে বলেছিলেন, কলোম্বো টেস্ট যদি তারা হেরে যায় সেটা হবে তাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। আমি ঠিক জানিনা তিনি ঠিক কিসের ভিত্তিতে কথাটি বলেছিলেন! এটা ঠিক যে একটা সময় বাংলাদেশকে বলে কয়ে হারাতো শ্রীলঙ্কা। এটাও সত্য কথা জয়সুরিয়া, মারভান আতাপাত্তুদের সময় একবার নয়জন নিয়মিত খেলোয়ারকে বসিয়ে রেখেও তারা বাংলাদেশকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলো। কিন্তুু তাদেরকে তো এটাও মাথায় রাখা উচিত এটা ২০০৬ সাল নয়, এটা ২০১৭! সময়গুলো থেমে নেই।


সবচেয়ে দৃষ্টিকটু বিষষ হচ্ছে, দ্য আইল্যান্ড নামে শ্রীলঙ্কান একটা পত্রিকা এই পরাজয়ের কারণে তাদের ক্রিকেটের মৃত্যুই ঘোষণা করে দিয়েছে! তারা লিখেছে গভীর দু:খের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে, কলোম্বতে ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের মৃত্যু হয়েছে। বন্ধু সুহৃদরা এই মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। শান্তিতে ঘুমাও। নোট: শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে এবং ছাই বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হবে। অদ্ভুত!! ভাবটা এমন যেন সোনালি যুগের সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বারমুডা হেরে গেছে!!


শ্রীলঙ্কান অধিপতিরা হয়তো ভেবেছিলেন বাংলাদেশ এখনও সেই আগের অবস্থায়ই আছে এবং তারাও সেই সময়কার মতই ছড়ি ঘোরাবেন ইচ্ছামত। কিন্তু অধিপতিগণ আপনাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই আপনাদেরও জয়সুরিয়া, আতাপাত্তু, সাঙ্গাকারা, জয়াবর্ধনে নেই আর আমাদের বাংলাদেশও আর সেই বাংলাদেশ নেই। সময় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আর সময়ের সঙ্গেই সবকিছু একসময় মেনে নিতে হয়। দয়া করে বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে শিখুন।


ফুলের রাজ্য জাহাঙ্গীরনগর (ফটো ব্লগ ৫)

দেশ জুড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচিত প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের লীলাভূমি হিসেবে। অতিথি পাখি,বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি, পশু-পাখি ও বি...