১২ অক্টোবর, ২০১২। পরদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে। দুদিন পর আমার সেখানে ভর্তি পরীক্ষা। সবকিছুই মোটামুটি গোছোনো শেষ। সোফার উপর বসে বসে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটে সার্চ দিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় লিখে। প্রথমেই যে লেখাটি আসলো তা হল “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাগ ও কিছু কথা”। বুঝলাম না ঠিক এই র্যাগ জিনিসটা কি! লিংকে ঢুকে যা দেখলাম তা পড়ে আমরা চক্ষু চড়কগাছ। নতুন শিক্ষার্থীদের উপর আদিম উপায়ে নির্যাতনের নানা কাহিনী লেখা ছিলো সেখানে। আমি আব্বু-আম্মুকে সঙ্গে সঙ্গে জানালাম ঘটনাটা। এবং একপ্রকার সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেললাম আমি জাবিতে পরীক্ষা দিচ্ছিনা। কিছুক্ষণ পর আব্বুর কাছে একটি ফোন আসে আমার এক পরিচিত আপু থেকে। সে ঘটনাটি জানতে পেরে আমাকে আশ্বস্ত করে যে এরকম কিছুই ঘটবেনা। আমি বলছি, তুমি পরীক্ষাটা দাও। শেষ পর্যন্ত এক প্রকার বাধ্য হয়েই আমি রাজি হলাম।
পরদিন ১৩ অক্টোবর, ২০১২। ডেইরি গেটে এসে বাস থেকে আব্বুর সঙ্গে নামলাম। ক্যাস্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম লোকে লোকারণ্য! (ভর্তি পরীক্ষার কারণে প্রচুর মানুষ ছিলো আসলে) আমার একদমই ভাল লাগলোনা পরিবেশটা । উঠলাম বঙ্গবন্ধু হলে এক পরিচিত ভাইয়ের কাছে। আব্বু আমাকে রেখে চলে গেলো। ভয়ে ভয়ে ঐ রাতটা কাটালাম। পরবর্তী কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি ইউনিটে পরীক্ষা দিলাম। চান্সও পেলাম কয়েকটিতে। আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরও আপেক্ষাকৃত পছন্দের সাবজেক্ট পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভতি হলাম সেই জাবিতেই। কি অদ্ভুত না? যেখানে পরীক্ষাই দিতে চাচ্ছিলাম না সেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার পরও ভর্তি হলাম এখানেই। অখুশি হয়তো হইনি কিন্তু অবাক হয়েছিলাম যথেষ্টই। কেননা এখানে তো আমার পরীক্ষাই দেওয়ার কথা ছিলোনা! যাই হোক র্যাগের ভয় যেহেতু ভেতরে ছিলো তাই হলে ওঠার সাহস পেলাম না। উঠলাম সাভারের ছায়াবিথীতে।
২৬ জানুয়ারী, ২০১৩। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাস ছিলো সেদিন। ভয়ে ভয়ে নতুন কলার নিচ তলায় একটি ক্লাসে গিয়ে বসলাম। কাউকে চিনিনা। পরে জানলাম আমদের ক্লাস হবেনা সেদিন। শুধু নতুন ব্যাচ হিসেবে বরণ করে নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানটির দুটো পর্ব ছিলো। একটি হচ্ছে শিক্ষকরা কথা বলবেন এবং পরে গিয়ে ইমিডিয়েট সিনিয়ররা কথা বলবেন। শিক্ষকরা যত সময় ছিলো বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। এরপর শিক্ষকরা চলে যাওয়ার পর সিনিয়ররা কথা বলতে আসলেন। সত্যি বলতে তাদের কড়া কথা শুনে খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু পরবর্তীতে বুঝতে পারি আসলে সেদিন তারা আমাদের কড়া ভাবে কথা বললেও তা ছিলো শুধুই আমাদেরকে শেখানোর উদ্দেশ্যেই। ক্যাম্পাসে যাতে আমরা ভালোভাবে চলতে পারি সেজন্যই তারা আমাদের কিছু সাধারণ জিনিস শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
সত্যি বলতে প্রথম দিকে ক্যাম্পাস টাকে খুব বেশি ভালো লাগতো না। নিজেকে মনে হতো পরাধীন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতাম তা কেনো যেন মেলাতে পারতাম না। কিন্তু কিছুদিন যাবার পরই আমার সকল সংশয় কেটে গেলো। ক্যাম্পাসের কালচারটা বুঝতে শুরু করলাম। বুঝতে পারলাম আমি আসলে এতদিন ভুলই বুঝেছি।
প্রথম দিকে হলে না উঠলেও প্রথম বর্ষের মাঝামাঝিতে হলে উঠি আমি। বেশ কিছুদিন গণরুমেও থেকেছি আমি। কষ্ট করেই থাকতে হয়েছে বটে সেখানে। কিন্তু এই একসাথে থাকার ফলে সবার সাথে যে হৃদ্যতা তৈরি হয়েছিলো তা আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে আমার হতো বলে মনে হয়না।
আস্তে আস্তে ক্যাম্পাসের প্রেমে পড়ে যেতে শুরু করি আমি। খারাপ লাগা গুলোও একসময় ভালো লাগায় পরিণত হয়। ঐ একসাথে গণরুমে থাকার কষ্টটাও পরে আনন্দে পরিণত হয়। যে সিনিয়র গুলো সবচেয়ে রাফ ব্যবহার করতো, যাদেরকে দেখে ভয়ে জুবুথুবু হয়ে থাকতাম একসময় দেখা গেছে তারাই সবচেয়ে বেশি কাছের হয়ে গেছে। হলের খাবার খেতেও একসময় খুব কষ্ট হতো। এখন যে হয়না তা নয়। তবে কেনো যেনো ঐ খাবারগুলোর প্রতিও এখন ভালবাসা তৈরি হয়ে গেছে।
আমার ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সবসময়ই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত। প্রতিটি ঋতুতে এটি রুপ বদলায়। আর এখানে প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে আলাদা আলাদা সৌন্দর্য্য।
গ্রীষ্মকাল আসলে একসাথে কাাঁচা আম পেড়ে ভর্তা মাখানো কিংবা টারজান পয়েন্টে বিভিন্ন ফলের জুস খাওয়া ছিলো আমাদের রুটিন মাফিক। নিয়ম করে এটা করতাম আমরা। কিংবা প্রচন্ড গরমের সন্ধ্যায় সারা দেশের সব জায়গার মানুষের প্রাণ যেখানে অতিষ্ট সেখানে ব্যাতিক্রম ছিলো আমার ক্যাম্পাস। প্রচন্ড রৌদ্রতাপের দিনেও জাবিতে সুশীতল বাতাস বইতো। গরমের সন্ধ্যায় জাবির সেন্ট্রাল ফিল্ড ছিলো যেনো এক টুকরো স্বর্গ। সবাই মিলে ঝিরিঝিরি বাতাসে ডেয়ার-ট্রুথ গেম খেলার আনন্দের কথাও ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা বন্ধুরা সন্ধ্যায় যারা এটা খেলতাম তারাই শুধু জানি এর মজাটা কি।
জাবিতে বর্ষা কতটা মাদকতা ছড়াতে পারে তা শুধু যারা বৃষ্টিতে ভিজেছে তারাই বলতে পারে। বৃষ্টি হওয়ার পর পিচ ঢালা রাস্তায় দলবেধে হাাঁটাও জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহুর্তগুলোর ভেতর একটা। লেকগুলো এসময় পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। লেকগুলোতে মাছ ধরতে গেলে অনেক মাছও পাওয়া যায় এসময়।
তবে জাবি তার শ্রেষ্ঠ রুপ প্রকাশ করে সম্ভবত শীতকালে। শীতকালের সকালে ছবি তোলা বা একসাথে কুয়াশার চাদর মোড়ানো সকালে ঘুরে বেড়ানোর মত আনন্দদায়ক অনুভুতি বোধহয় আর নেই। শীতের সকালে ডেইরি গেটে এসে গরুর দুধের চা খেয়ে নাস্তা করে পুরো ক্যাম্পাস চক্কর দেওয়ার আনন্দ টাও সীমাহীন। শীতকালে জাবির অতিথি পাখি সম্ভবত পুরো বাংলাদেশের ভেতরেই আলাদা কিছু। প্রতি শীতেই দেখা যায় সূদুর সাইবেরিয়া থেকে এখানকার লেকগুলোতে শতশত প্রজাতির পাখি আসে।
আর সেগুলো অবলোকন করতে ছুটির দিনগুলোতে বহু দূর থেকেও পর্যটকরা আসে। হয়তো অনেক সময় আমরা নিজেরাও এত এত মানুষ দেখে বিরক্ত হই। কিন্তু পরক্ষণেই গর্বে বুকটা ভরে যায় নিজের ক্যাস্পাসের এরকম গ্রহণযোগ্যতা দেখে।শীতের সময়ে জাবির পিঠা চত্ত্বরের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার ভেতর জাবিতে নানা ধরনের পিঠার পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। এগুলো খেতে যেমন সুস্বাদু দেখতেও তেমনি চমৎকার। আর এজন্য জাবির শীতকাল বিশেষ কিছুই আমাদের জন্য।
আর সেগুলো অবলোকন করতে ছুটির দিনগুলোতে বহু দূর থেকেও পর্যটকরা আসে। হয়তো অনেক সময় আমরা নিজেরাও এত এত মানুষ দেখে বিরক্ত হই। কিন্তু পরক্ষণেই গর্বে বুকটা ভরে যায় নিজের ক্যাস্পাসের এরকম গ্রহণযোগ্যতা দেখে।শীতের সময়ে জাবির পিঠা চত্ত্বরের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার ভেতর জাবিতে নানা ধরনের পিঠার পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। এগুলো খেতে যেমন সুস্বাদু দেখতেও তেমনি চমৎকার। আর এজন্য জাবির শীতকাল বিশেষ কিছুই আমাদের জন্য।
সারাদেশের ভেতর একমাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রজাপতি মেলা বসে। এটি নি:সন্দেহে স্বতন্ত্র একটি মেলা। বহু দুর-দুরান্ত থেকে এই প্রজাপতি মেলা দেখার জন্য মানুষ আসে এই ক্যাম্পাসে। গত চার বছরে আমার নিজেরও অনেক বন্ধু ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসেছিলো শুধুমাত্র প্রজাপতি মেলা দেখার উদ্দেশ্যে। এখানে প্রায় ১০০ প্রজাতির প্রজাপতি প্রদর্শিত হয় প্রতিবছর।
জাবিকে বলা হয় সাংস্কৃতিক রাজধানী। শুধু শুধু যে এটা বলা হয়না তার প্রমাণ পাওয়া যায় সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে গেলেই। খুব কম দিনই আমি নিজে দেখেছি যে ওখানে কোন প্রোগ্রাম থাকেনা। সেটা হোক লোকাল কোন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রোগ্রাম কিংবা বাইরে থেকে আনা কারও পরিবেশিত প্রোগ্রাম। আমার জানা নেই আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এত প্রোগ্রাম হয় কিনা।
আমি নিজে যদি মতামত দিই.. তবে বলবো জাবির দিন অপেক্ষা রাতের সৌন্দর্য্য বেশি। রাতের ক্যাম্পাসে ঘুরতে বের হলে দেখা যায় ট্রান্সপোর্টে ছেলে-মেয়েরা গান গাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। টারজান পয়েন্টে গেলে বন্ধুদের হাসি মাখা মুখগুলো চোখে পড়ে। ক্যাফেটেরিয়ার সামনে গেলেও দেখা যায় একই অবস্থা। বটতলা তো সবসময়ই মুখরিতই থাকে। রাত হলে তা যেনো আরও পূর্ণতা পায়। যেখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত আটটা বাজলেই সবাইকে হলে ফিরে যেতে হয় । সেখানে জাবিতে সন্ধ্যায় হয় আটটার সময়! আর এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা। রাত ১২ টা পর্যন্ত বাইরে থাকলেও এখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোন চিন্তা করতে হয়না। বিশেষ করে জাবির চেয়ে নিরাপদ জায়গা মেয়েদের জন্য আর কোথাও মনে হয়না আছে।
আমার ক্যাম্পাসের আরেকটি বড় ভালবাসা, আবেগের জায়গা হচ্ছে আমার বিভাগ। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ণ বিভাগ। অনেক অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বিভাগের সঙ্গে। স্মৃতি থাকার মতো যথেষ্ট কারণও আছে। বন্ধু-বান্ধব, বন্ধুর মতো কয়েকজন শিক্ষক সবার সাথেই এতদিনে গড়ে উঠেছে হৃদ্যতার সম্পর্ক । এজন্য এখন প্রতিদিন যখন ক্লাসে যাই তখন একটা দিক থেকে খুব খারাপ লাগে যে এক এক দিন করে কমে আসছে সময়। আর যে খুব বেশি দিন নেই আমরা! সত্যি বলতে যেদিন এই বিভাগ, এই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে হবে জানিনা কিভাবে নিজেকে সমাল দিবো।
আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি যেখানে আমি ভর্তি পরীক্ষা দিবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভাগ্য আমাকে এখনেই নিয়ে এসছিলো। আমার ভাগ্যের কাছে সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ। প্রথম দিকের সেই খারাপ লাগার কথা মনে হলে এখন আমার আফসোস হয় যে অযথাই এতগুলো সুন্দর সময় নষ্ট করেছি! এটা আমার বলতে একদম দ্বিধা নেই যে এটিই আমার দ্বিতীয় জন্মের আঁতুড়ঘর। আমার পরিচয়। আমার ভালবাসা, আমার আবেগের জায়গা। ভালবাসি “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়”। ভালবাসি তোমার লাল ইটের ভবন গুলো, ভালবাসি তোমার মাটি, ফুল, পাখি সবকিছু।


